মূল্য সংকোচনের চাপ

টানা তৃতীয় বছরে চীনে করপোরেট মুনাফা পতনের আভাস

চীনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রভাব পড়েছে দেশটির করপোরেট খাতে।

চীনের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক মন্থরতার প্রভাব পড়েছে দেশটির করপোরেট খাতে। দুই বছর ধরে এ খাতের কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমেছে, ২০২৪ সালের চূড়ান্ত আর্থিক ফলাফল আসার আগেই সে ধারা অব্যাহত থাকার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরো এনবিএস ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে মূল্য সংকোচনজনিত চাপের কারণে করপোরেট খাতে মুনাফা পতনের প্রবণতা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। খবর এফটি।

এনবিএসের তথ্যানুসারে, ২ কোটি ইউয়ান বা তার বেশি আয় করা করপোরেট কোম্পানির মুনাফা ২০২৩ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত গড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। ২০২২ সালে কভিড-১৯ মহামারীর সময় মুনাফা কমার হার ছিল ৪ শতাংশ।

অন্যদিকে গত বছরের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত ২০২৩ সালের একই সময়ের তুলনায় কোম্পানিগুলোর আয় বেড়েছে ১ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২২ সালে আয় বেড়েছিল ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

এছাড়া গত বছর লোকসানে পড়া কোম্পানির সংখ্যাও বেড়েছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত ২ কোটি ইউয়ান বা তার বেশি আয় করা কোম্পানিগুলোর ২৫ শতাংশই সরাসরি লোকসান দেখেছে। ২০১৯ সালে মহামারীর আগের পুরো বছরে এ হার ছিল ১৬ শতাংশ।

মরগান স্ট্যানলির চিফ চায়না ইকুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট লরা ওয়াং বলেন, ‘পণ্য ও সেবার মূল্য কমে যাওয়াই মুনাফা কমার প্রধান কারণ।’

আগামী শুক্রবার চীনের চতুর্থ প্রান্তিকের (অক্টোবর-ডিসেম্বর) জিডিপি প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এটি প্রকাশিত হলে দেশটি ২০২৪ সালে ৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছে কিনা তা স্পষ্ট হবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় চীনের অর্থনীতি স্থবির ও ভোক্তা আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে।

বিশ্বের প্রভাবশালী অর্থনীতিটি দ্বিমুখী সংকটে পড়েছে। রফতানি বাড়া সত্ত্বেও অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমায় অর্থনীতি চাপে পড়েছে। অন্যদিকে সম্পত্তি খাতে দীর্ঘমেয়াদি মন্দার কারণে ভোক্তা চাহিদাও বাড়ছে না।

২০২৪ সালের ডিসেম্বরে চীনের রফতানি ডলারের হিসাবে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে। রফতানি প্রবৃদ্ধির এ হার রয়টার্সের বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস ৭ দশমিক ৩ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে। চীনের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ২০২৩ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে গত বছর তা উৎপাদকদের অতিরিক্ত সরবরাহ চাপ কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়নি। বিক্রি বাড়াতে উৎপাদকরা রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে দাম কমিয়েছেন। ফলে মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

এনবিএস জানিয়েছে, উৎপাদক মূল্য সূচক টানা ২৮ মাস ধরে নিম্নমুখী। অর্থনীতিবিদদের মতে, চলতি বছরেও এ প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে।

সিটি ব্যাংকের বিশ্লেষকরা এক প্রতিবেদনে বলেন, ‘পণ্যের দাম কমার কারণে করপোরেট মুনাফা সংকুচিত হয়ে পড়ছে। এছাড়া চাহিদা হ্রাস ও অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার কারণে মুনাফা কমে যাচ্ছে। এ কারণে বেসরকারি বিনিয়োগ পরিস্থিতি আরো প্রভাবিত হচ্ছে।’

প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সরকার চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত বড় প্রতিষ্ঠানকে ব্যাপকভাবে সহায়তা দিয়েছেন। তা সত্ত্বেও এনবিএসের করপোরেট মুনাফাসংক্রান্ত প্রতিবেদনে এসব প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে খারাপ পারফর্ম করেছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৪ শতাংশ কমে গেছে। অন্যদিকে বেসরকারি ও বিদেশী কোম্পানিগুলোর মুনাফা কমেছে ১ শতাংশ বা তার কম।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বেইজিং সরকারের বাস্তবায়ন করা বিভিন্ন সামাজিক বা ভূরাজনৈতিক কৌশলের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা দূর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে তা অর্থনীতির ওপর বাড়তি বোঝা তৈরি করেছে। এ ধরনের পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে শেয়ার ক্রয় বা বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় আন্তর্জাতিক অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ।

বিশ্বব্যাংকের ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ গ্রুপের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ লিক্সিন কলিন সু বলেন, ‘বর্তমান হারে মুনাফা কমতে থাকলে সরকারের প্রণোদনা নীতি দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’

চায়না অ্যাসোসিয়েশন ফর পাবলিক কোম্পানিজের তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালের প্রথম নয় মাসে মূল ভূখণ্ডে ৫ হাজার ৩৬৮টি তালিকাভুক্ত কোম্পানির মধ্যে ২৩ শতাংশ নিট ক্ষতির মুখে পড়েছে। অন্যদিকে ৪০ শতাংশ কোম্পানির মুনাফা ও ৪৫ শতাংশ কোম্পানির আয় কমেছে।

মরগান স্ট্যানলির লরা ওয়াংয়ের পূর্বাভাস অনুসারে, এমএসসিআই চায়না সূচকে থাকা কোম্পানিগুলোর মুনাফা ২০২৫ সালে ৫ শতাংশ বাড়বে, যা গত বছরের ৭ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম।

তিনি বলেন, ‘পণ্যের দাম কমায় আয় বাড়ানো কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই কোম্পানিগুলোকে এখন শেয়ার বাইব্যাক বা লভ্যাংশ দেয়ার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের মুনাফার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।’

পাশাপাশি ব্যবসা কৌশল পরিবর্তনের পরামর্শও দেন লরা ওয়াং। তিনি বলেন, ‘২০-৩০ বছর ধরে কোম্পানিগুলো তাদের আয় পুনর্বিনিয়োগ করে নতুন বাজার দখল বা ব্যবসার সম্প্রসারণে কাজ করেছিল। এ দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে।’

আরও